পুঁজিবাদের মধ্যেই তার ধ্বংস বা পতন বা বিনাশের বীজ নিহীত কার্ল মার্কস

পুঁজিবাদের মধ্যেই তার ধ্বংস বা পতন বা বিনাশের বীজ নিহীত- কার্ল মার্কস

অথবা, কার্ল মার্কসের মতে, 'অভ্যন্তরীণ অন্তদ্বন্দ্বের ফলেই ধনতন্ত্রের ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী-ব্যাখ্যা কর

ভূমিকা: আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজের উৎপত্তি সামন্ততান্ত্রিক সমাজের ধ্বংসস্তূপের ওপর হয়েছিল। এই যুগে শ্রেণি-সংঘাত খুবই তীব্র আকার ধারণ করে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পণ্য উৎপাদন কলকারখানায় হয়ে থাকে এবং উৎপাদন হয় বৃহৎ পরিবার। দ্বন্দ্ববাদের তত্ত্ব অনুসারে, পুঁজিবাদী সমাজে দুটি শ্রেণি গড়ে ওঠে (১) বুর্জোয়া শ্রেণি (২) সর্বহারা শ্রেণি। এই দুটি শ্রেণি পরস্পর পরস্পরকে ছাড়া চলতে পারে না। পরস্পর পরস্পরকে পুঁজিপতিদের কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। অন্যদিকে পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের কারখানায় কাজ/চাকরি না দিলে শ্রমিকরা না খেয়ে মারা যাবে। দুটি শ্রেণিই পরস্পরের পরিপূরক হলেও নিজ নিজ স্মার্থ নিয়ে তারা সংঘর্ষে লিপ্ত থাকে। পুঁজিপতিরা উৎপাদন প্রক্রিয়ার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখায় শ্রমিকদের কাজের ওপর শর্ত আরোপ করে, শর্ত চাপিয়ে দেয়। অন্যদিকে, শ্রমিকগণ তাদের অবস্থা পরিবর্তনের জন্য, ভালো বা অধিক বেতন প্রাপ্তির জন্য এবং কাজের সময় কমানোর জন্য পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে বিপ্লবের সূচনা করে। এই বিপ্লবের পরিণামস্বরূপ পুঁজিবাদের বিনাশ বা ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী। কারণ স্বয়ং পুঁজিবাদের মধ্যেই তার বিনাশের বা ধাংসের বীজ ব্যাপৃত আছে। মার্কস বলেন, যে অস্ত্র দ্বারা বুর্জোয়াশ্রেণি সামন্তবাদের যবনিকা ঘটায়, সেই বিদ্যাই এখন সম্পত্তিশালী পুঁজিপতি শ্রেণির বিনাশ বা ধ্বংস ঘটাতে তার বিরুদ্ধে প্রেরিত হচ্ছে। এভাবে মার্কস অনুসারে, পুঁজিবাদের প্রকৃতি এমনই যে, সে (পুঁজিবাদ) তার নিজের কবর নিজেই খুঁড়ে অর্থাৎ (Capitalizon digs its own grave)

পুঁজিবাদের মধ্যেই তার ধ্বংস বা পতন বা বিনাশের বীজ নিহীত কার্ল মার্কস

পুঁজিবাদের বিনাশ বা ধ্বংস বা পতনের কারণ:

মার্কসের মতে, অভ্যন্তরীণ অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলেই পুঁজিবাদের ধনতন্ত্রের ধ্বংস আবশ্যম্ভাবী। আমরা এখানে সেই সকল বিষয় নিয়ে আলোচনা করব, যা পুঁজিবাদীব্যবস্থায় শ্রেণিসংঘাতে তীব্রতার জন্য এবং পুঁজিবাদের পতন বা ধ্বংসের জন্য দায়ী।

১. ব্যক্তিগত লাভের জন্য উৎপাদন:

পুঁজিবাদীব্যবস্থায় উৎপাদন, সমাজের স্বার্থ ও সমাজে আর উপযোগিতাকে মাথায় রেখে করা হয় না। বরং ব্যক্তিগত লাভকে মাথায় রেখে করা হয়।

২. বিশাল উৎপাদনে একচ্ছত্র অধিকার ও পুঁজির সঞ্চয়:

পুঁজিবাদীব্যবস্থায় কারখানার দ্বারা দ্রুতগতিতে এবং অধিক মাত্রায় উৎপাদন করা যায়। তার ওপর সংখ্যালঘু পুঁজিপতিদের হাতেই পুঁজি কেন্দ্রীভূত থাকে এবং শ্রমিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বলতে কিছুই থাকে না।

৩. ক্রমহ্রাসমান লভ্যাংশ:

পুঁজিবাদের পতনের বা ধ্বংসের আরেকটি কারণ হলো ক্রমহ্রাসমান লভ্যাংশের হার। পুঁজিবাদের প্রথম দিকের ক্রমবর্ধমান লভ্যাংশের হার পরবর্তীতে ক্রমহ্রাসমান লভ্যাংশ প্রাপ্তির পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। মূলধন বিনিয়োগের প্রাপ্ত লভ্যাংশ ও সুদের হার হ্রাস পেতে থাকলে পুঁজিবাদের মধ্যে অনিবার্য অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে, যা পুঁজিবাদের পতনের সহায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করে।

৪. আর্থিক সংকট ও শ্রমিকদের দুর্দশা:

উৎপাদনব্যবস্থা সময়ে সময়ে বহু অর্থনৈতিক সংকট এবং শ্রমিকের কষ্টের তথ্য দুর্দশা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দেখা দেয়। উৎপাদনব্যবস্থার সাথে তথা উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত অর্থ পুঁজিপতিদের হাতে চলে আসায় সর্বহারা শ্রমিকেরা আরও গরিব হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, শ্রমিকদের বাক্তিত্ব বিনষ্ট হয়, তারা যন্ত্রের মতো যান্ত্রিক হয়ে যায়, সর্বোপরি তারা বস্তুতে পরিণত হয়। এই অবস্থায় বেকারত্ব বেড়ে যায়। শ্রমের মূল্য কমে যায়। শ্রমিকশ্রেণির ওপর দমনমূলক ব্যবহার ও শোষণের মাত্রা বেড়ে যায়।

৫. অতিরিক্ত মূল্য পুঁজিপতির দ্বারা কুক্ষিগত করা:

পুঁজিবাদে উৎপদন সামাজিক চাহিদা পূরণের জন্য নয় বরং ব্যক্তিগত লাভের জন্য করা হয়। অতএব, পুঁজিপতি অতিরিক্ত মূল্য নিজের কাছে রেখে দেয়।

৬. উৎপাদন ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান হ্রাস:

পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থার একটি বিশেষ স্তরে মুনাফার হার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান হ্রাস পেতে শুরু করলে মালিকপক্ষ উৎপাদন ক্ষমতাকে আরও বিজ্ঞানসম্মত করে তোলার চেষ্টা করে। এই উদ্যোগ বারবার প্রয়োগের ফলেও সংগঠকদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা আরও সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। ফলে তুলনামূলক কর্মদক্ষ শিল্প সংগঠকগণ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরাজিত হয়ে শিল্পজগৎ থেকে ছিটকে পড়বে এবং শিল্পপতি পরিচালিত প্রতিষ্ঠানসমূহের সংখ্যা আরও হ্রাস পেতে থাকলে পুঁজিবাদের শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। ফলে পুঁজিবাদের পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।

৭. ব্যক্তিগত উৎপাদন সমাপ্তি:

পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থা শ্রমিকের ব্যক্তিগত চরিত্রে রূপ নেই। উদ্যোগের স্থানীয়করণ শ্রমজীবীদের সংঘাতের জন্য বরংবার প্রমাণিত হয়। তখন অসন্তুষ্ট শ্রমিকেরা পরস্পর সংগঠিত হয়, একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেয় এবং তাদের মধ্যে শৃঙ্খলা, একতা ও সহযোগিতার ভাব গড়ে ওঠায় তখন তারা পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, যা পুঁজিবাদের পতনকে ত্বরান্বিত করে।

৮. সংকট উত্তরণের প্রচেষ্টা ব্যর্থ:

ক্রমহ্রসমান মুনাফার হার থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য শিল্পপতিগণ অতিরিক্ত লাভের সম্ভাবনায় অনুন্নত অঞ্চলে মূলধন বিনিয়োগ শুরু করে। কিন্তু তাদের অল্পকালের মধ্যে তাদের প্রচেষ্টা ও নীতি বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে অর্থাৎ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। কেননা, প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থায় এসব উপনিবেশেও মূলধন বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় এবং স্থানীয় শিল্পোদ্যোগীগণ মূলধন বিনিয়োগ শুরু করলে অবস্থা সংকটজনক হয়ে পড়ে। ফলে মুনাফা বৃদ্ধির পরিবর্তে কমতে থাকায় পুঁজিপতিরা রুগৃণ হয়ে পড়ে এবং পুঁজিবাদ পতনের মুখে এসে দাঁড়ায়।

৯. আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের জন্ম:

পুঁজিবাদীব্যবস্থায় উৎপাদিত বস্তু বা পণ্য বিক্রয়ের জন্য জাতীয় উৎপাদিত বস্তু বা পণ্য বিক্রয়ের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বা পণ্য বিক্রয়ের জন্য জাতীয় ও 'আন্তর্জাতিক বাজারের খোঁজ করা হয়। এর ফলে যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি করা হয়। এই যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির পরিমাণস্বরূপ জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অর্থাৎ বিভিন্ন স্থানের শ্রমিকদের একত্রীকরণের পথ সুগম হয়। এই সুসংগঠিত শ্রমিক সংগঠন নিজস্ব স্বার্থকেন্দ্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে পুঁজিবাদের বিদায় ঘন্টা বাজায়।

উপসংহার: শ্রেণিসংঘাতের ভিত্তিতে কাল মার্কস বলেন, পুঁজিবাদের প্রকৃতি হলো আত্মনাশী লাভের প্রবৃত্তি, উদ্বৃত্ত মূল্য কুক্ষিগত করা, পুঁজির কেন্দ্রীকরণ, শ্রমিকদের মধ্যে বর্ধনশীল বেকারত্ব এবং দরিদ্রতা, শ্রমিকদের ওপরে শোষণ, পুঁজিপতি যারা শ্রমিকদের ওপর অন্যায় ও অত্যাচারপূর্ণ ব্যবহার, চাহিদার চেয়ে অধিক পূরণ, অধিক উৎপাদন, বাজারকে উৎপাদিত দ্রব্য ছাপিয়ে যাওয়া, আর্থিক সংকট, যাতায়াত ও যোগাযোগের ব্যাপ্তি, শ্রমিকশ্রেণির চেতনা ও সহমর্মিতা ভাবের উৎপত্তি প্রভৃতি উপাদানের সমাবেশ এমনভাবে ঘটে, যা পুঁজিবাদের কবর খুঁড়তে সাহায্য করে, অর্থাৎ Capitalism digs its own grave

Md Belal Hossain

আমি মোঃ বেলাল হোসাইন, বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স/স্নাতকোত্তর (M.S.S) ডিগ্রী অর্জন করেছি এবং Shikhaprotidin-এর প্রতিষ্ঠাতা। Shikhaprotidin একটি শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম যেখানে আমি সমাজবিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করি ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক দিকনির্দেশনা প্রদান করি।

নবীনতর পূর্বতন